যেকোন ধরণের ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর জানতে বামে মেজেজ্ঞার আইকনে ক্লিক করে আমাদের প্রশ্নটি লাইভ চ্যাটের মাধ্যমে জানান, SanatanLive.blogspot.com

সার্জারির জনক মহর্ষি সুশ্রুত

তিনি সুশ্রুত সংহিতা গ্রন্থটির মূল লেখক, প্রাচীন ভারতীয় ঋষি, চিকিৎসক,প্লাস্টিক সার্জারির জনক এবং অস্ত্রোপচারের জনক।

পরিচিতি : সুশ্রুত, অথবা Suśruta ( সংস্কৃত : सुश्रुत, IAST: Suśruta, শয়নকামরা "ভাল শুনে") একজন প্রাচীন ভারতীয় চিকিত্সক ছিলেন যিনি সুশ্রুত সংহিতা গ্রন্থটির মূল লেখক।

সুশ্রুতের জন্ম হয়েছিল আনুমানিক ৬০০খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। অর্থাৎ আজ থেকে ২৬০০+বছর আগে।

মহর্ষি সুশ্রুতের জন্মকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের ভেতরে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। হরিদ্বারের ‘পতঞ্জলি যোগপীঠ’ এ মহর্ষি সুশ্রুতের একটি আবক্ষ মূর্তি রয়েছে।

সেখানে তার জীবনকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে তিনি জীবিত ছিলেন। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তার জীবনকাল অতিবাহিত হয়েছিলো খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সাল থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ সালের ভেতরে কোনো এক সময়ে। টাকলামাকান মরুভূমির প্রাচীন এক বৌদ্ধবিহার থেকে পাওয়া গুপ্ত যুগের বাওয়ার লিপিতে উল্লেখ পাওয়া যায় মহর্ষি সুশ্রুতের। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা এই পান্ডুলিপিতে তাকে হিমালয়ে বসবাসরত দশজন মহান ঋষির একজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনীতে সুশ্রুতকে বর্ণনা করা হয়েছে ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্র কিংবা ধন্বন্তরীর বংশধর হিসেবে, যা সুশ্রুত সংহিতার সংযোজনের সাথে মিলে যায় । হিন্দু পুরাণ অনুসারে ধন্বন্তরীর পরিচয় পাওয়া যায় দেবতাদের চিকিৎসক হিসেবে। কুঞ্জলাল ভিসাগ্রত্ন মতামত দিয়েছেন যে এই অনুমান করা ঠিক যে সুশ্রুত যেই বংশের নাম ছিল সেটা তেই বিশ্বমিত্র ছিলেন। অনেকে বলেন ধন্বন্তরীর (ধন্বন্তরী ছিলেন কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক) কাছেই সুশ্রুতের শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই রোগ নিরাময়ের বিষয়ে তাঁর খুব আগ্রহ ছিল। সেখানকার পাঠ শেষ করে সুশ্রুত নিজেও ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে যোগ দেন। তিনি " অস্ত্রোপচারের জনক " এবং "প্লাস্টিক সার্জারির জনক" হিসাবে পরিচিত।

সুশ্রুত-সংহিতা :


সুশ্রুত সংহিতা’ দুটি মূল অংশে বিভক্ত। প্রথম পাঁচটি অধ্যায় নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘পূর্বতন্ত্র’ এবং পরের অংশটি ‘উত্তরতন্ত্র’। ছয়টি কাণ্ডে বিভক্ত ১৮৬টি অধ্যায়ে বিধৃত এই মহাগ্রন্থ। এতে প্রায় ১,১২০টি মেডিকেল কন্ডিশন বা অসুস্থতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ৭০০টি ওষধি গাছের বর্ণনা এবং তাদের ব্যবহার। খনিজ পদার্থজাত ৬৪টি এবং প্রাণীজ উৎসজাত ৫৭টি ওষধি দ্রব্যের বর্ণনা পাওয়া যায় তার গ্রন্থে। মূল লেখাটি ছিল, তালপাতার ওপর সংস্কৃত ভাষায় এ পাণ্ডুলিপিটি। ১২১ রকমের সার্জারির যন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে, তার ৫৬টির বিশদ বর্ণনা। যন্ত্রগুলিকে সুশ্রুত দুভাগে ভাগ করেছিলেন। যেগুলো ভোঁতা, নাম দিলেন যন্ত্র। আর যেগুলো সরু ও ধারালো তার নাম দিলেন শস্ত্র। যন্ত্র ছিল ১০১ রকম। শস্ত্র ছিল বাকি ২০ রকম। কামারদের কাছ থেকে কী করে অতি সূক্ষ সেসব যন্ত্র বানিয়ে নিতে হবে, তারও উপদেশ রয়েছে তার বইয়ে।

সুশ্রুতের দেওয়া যন্ত্রগুলোর নাম হল: মণ্ডলাগ্র ছুরিকা, করপত্র ব্রীহিমুখ, বৃদ্ধিপত্র, নখ
সংগৃহিত।

পাঠ্যটিতে শল্য চিকিত্সা, পরীক্ষা করা, বিদেশী সংস্থাগুলি নিষ্কাশন, ক্ষার এবং তাপ কৌতুককরণ, দাঁত নিষ্কাশন, ক্ষরণ, এবং ফোলা নিকাশী জন্য ট্রোকার, হাইড্রোসিল এবং অ্যাসিডিক তরল প্রসেট, প্রোস্টেট গ্রন্থি অপসারণ, মূত্রনালী স্ট্রাকচার বিচ্ছিন্নতা, ভ্যাসিকোলিথোটোমি, হার্নিয়া সার্জারি, সিজারিয়ান বিভাগ, রক্তক্ষরণ, ফিস্টুলি, ল্যাপারোটমি পরিচালনা এবং অন্ত্রের বাধা পরিচালনা, ছিদ্রযুক্ত অন্ত্র এবং পেটের দুর্ঘটনাক্রমে ছত্রাকের প্রসারণ এবং ফ্র্যাকচার ম্যানেজমেন্টের নীতিগুলি, যেমন, ট্র্যাকশন, ম্যানিপুলেশন, প্রয়োগ এবং স্থিতিশীলতা সহ কিছু পুনর্বাসন এবং সিন্থেটিক ফিটিং ব্যবস্থা। এটি ছয় প্রকার বিশৃঙ্খলা, বারো প্রকারের ভাঙ্গন এবং হাড়ের শ্রেণিবিন্যাস এবং আঘাতের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়ার গণনা করে এবং ছানি শল্য চিকিত্সা সহ চোখের রোগগুলির শ্রেণিবিন্যাস দেয়।

চিকিৎসাবিদ সুশ্রুত তার সার্জারি সময় রোগীর যন্ত্রণা কমাতে একটি বিশেষ আয়ুর্বেদিক প্রক্রিয়ার সাহায্য নিতে যা অ্যানেসথেসিয়ার মতই কাজ করে। এগুলো সুশ্রুত নিজে চিহ্নিত করেছিল। তিনি খুব ভালোভাবে বুঝতে শুধু থিওরির জ্ঞান দিয়ে সার্জারি সম্ভব নয় প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা খুব বেশি ভাবে প্রয়োজন তাই তিনি বিভিন্ন ফলের খোসা কে মানুষের চামড়ার মত ব্যবহার করতেন এবং সার্জারি ট্রেনিং নিতেন এবং দিতেন। এক্ষেত্রে তিনি বেশি ব্যবহার করতেন তরমুজ। শুধু তাই নয় সেই সময় অনেক মৃত দেহকে নদীর জলে ভাসিয়ে দিত মানুষ। সুশ্রুত মৃতদেহগুলি কে সংগ্রহ করে নিজের ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যবহার করত। এই ধরনের কাটাছেঁড়া কে ভালোভাবে নেয়নি সমাজের অনেক উচ্চ বৃত্তের মানুষরা যারা মনে করত সুশ্রুত ব্রাহ্মণ সত্ত্বেও নিচু ধর্মের মানুষের শরীর নিয়ে কাটাছেঁড়া করে। এই অবস্থায় সুশ্রুত লোকালয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন মাঠের মধ্যে নিজের কর্মকাণ্ড জারি রেখেছিল। পার্সিয়ার খলিফ আল মানসুদ এই সুশ্রুতা সংহীতাকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন। যার নাম হয় “কিতাব আল-সুশ্রুতা”।

মহর্ষি সুশ্রুতের ব্যবহৃত কয়েকটি যন্ত্র: তিনি তার গ্রন্থের বড় অংশই বরাদ্দ রেখেছেন শল্যচিকিৎসা বা সার্জারির জন্য। অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোকে তিনি সূক্ষ্ম এবং স্থূল, এই দু’ভাগে ভাগ করেন। কামারের কাছ থেকে কীভাবে এই যন্ত্রগুলো তৈরি করা যাবে, তারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তার ব্যবহৃত কয়েকটি যন্ত্রের নাম মণ্ডলাগ্র সূচিকা, কুশপত্র, উৎপল পত্র, শবরিমুখ কাঁচি, অন্তর্মুখ কাঁচি প্রভৃতি।



প্রাচীন ভারতীয় পাঠ্য সুশ্রুত সংহিতা যন্ত্রে, ৪ টির মধ্যে ৪ টি অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম দেখায়

প্রাচীন ভারতীয় পাঠ্য সুশ্রুত সংহিতা শাস্ত্র এবং কর্তরিকা, অস্ত্রোপচার যন্ত্রসমূহ ৪ এর ১


তিনি অস্ত্রোপচারের পদ্ধতিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করেন। এগুলো হচ্ছে,

* ছেদন (excision)- কেটে বাদ দেওয়া। যেমন মারাত্মক ক্ষত হয়ে যাওয়া আঙুল বা নিরাময়ের অযোগ্য পা।

* লেখন (sacrification)- কোনো একটি অংশকে দাগ কেটে আলতোভাবে চিরে ফেলা কিংবা কোনো ক্ষতের বাড়তি মাংস বা ময়লা ছেঁচে তুলে ফেলা।

* ভেদন (puncturing)- কোনো অঙ্গে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে ছিদ্র করে পেটের গহ্বরে বা অণ্ডকোষে কিংবা মাংসপেশির মাঝে জমা হওয়া অস্বাভাবিক তরল ফেলে দেওয়া।

* এষণা (exploration)- আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না, এমন সব জায়গা যেমন দেহ গহ্বর কিংবা অসুখের ফলে সৃষ্ট সাইনাস সমূহ উন্মুক্ত করে পর্যবেক্ষণ করা।

* আর্য্যন (extraction)- উৎপাটন বা শরীরে ঢুকে যাওয়া কিছু (যেমন তীরের অগ্রভাগ) টেনে বের করা।

* সিবন(suturing)- অস্ত্রোপচারের পর উন্মুক্ত স্থান সেলাই করে দেওয়া।

আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় ঠিক এই কাজগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করা হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নাকের অস্ত্রোপচার যা এখন রাইনোপ্লাস্টি নামে পরিচিত, তখনকার সময় থেকেই চলে আসছে। সুশ্রুত সংহিতার ষোড়শ অধায়ে অটোপ্লাস্টি এবং ল্যারিংগোপ্লাস্টি’র মতো অপারেশনের বর্ণনা পাওয়া যায়।

এমনকি জীবাণুমুক্তকরণের উপরও তার নজর ছিলো। অস্ত্রোপচারের সময় ব্যথানাশক হিসেবে রোগীকে তিনি আঙুর থেকে তৈরি সুরা পান করতে দিতেন এবং ক্যানাবিস জাতীয় হিপ্নোটিক ড্রাগের ধোঁয়া শোঁকাতেন। ফলে রোগী অপেক্ষাকৃত কম যন্ত্রণা ভোগ করতো। ভাবতে অবাক লাগে, আজ থেকে কয়েক হাজার বছর পূর্বে একজন মানুষ তাঁর চিন্তাধারায় এতটা অগ্রগতি লাভ করেছিলেন।


সুশ্রুত সংহিতার বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ : মহর্ষি সুশ্রুত ও তার সুশ্রুত সংহিতা এতই বিখ্যাত ছিলো যে এটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। অষ্টম শতকে ‘কিতাব-ই-সুশ্রুত’ নামে আরবিতে অনূদিত হয় এটি। আরবি এই অনুবাদ মধ্যযুগের শেষমেশ ইউরোপে পৌছায়। ইতালিতে যে রাইনোপ্লাস্টি চালু হয়েছিলো, ধারণা করা হয়, তারা সুশ্রুত সংহিতা থেকে প্রভাবান্বিত ছিলো। ১৮৩৫ সালে কলকাতায় মধুসূদন দত্ত কর্তৃক ‘এডিটিও প্রিন্সেপ্স’ নামক সংস্করণ বের হয়। কবিরাজ কুঞ্জলাল ভিষকরত্ন ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১৬ সালের ভেতরে তিন খণ্ডে সুশ্রুত সংহিতার সম্পূর্ণ ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন।

প্রাচীন ভারতে সুশ্রুত পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। মৃতদেহ নিয়ে গবেষণা বা কাটাছেঁড়া নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে আস্তে আস্তে শল্যবিদদের দক্ষতা হ্রাস পেতে থাকে। জাতিভেদ প্রথাসহ সামাজিক শ্রেণিবিভাগ আরোপিত হওয়ার পর উঁচু শ্রেণির মানুষেরা ‘শল্যবিদ’ ব্যাপারকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। ধীরে ধীরে এই জ্ঞান হারিয়ে যায় আমাদের কাছ থেকে। হয়ত আমরা কখনোই জানতে পারতাম না আমাদের অতীতের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে, যদি না মহর্ষি সুশ্রুত আমাদের জন্য রেখে যেতেন তার অমর গ্রন্থ ‘সুশ্রুত সংহিতা’।

এছাড়াও গুগলে সার্চ করলেই বইটি কেনার জন্য বিভিন্ন ভাষায় পেয়ে যাবেন।

সুশ্রুত সংহিতা ওষুধের ক্ষেত্রে বেঁচে থাকা প্রাচীনতম গ্রন্থগুলির মধ্যে একটি এবং এটি আয়ুর্বেদের একটি মূল পাঠ হিসাবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থটি সাধারণ ওষুধের সমস্ত দিককেই সম্বোধন করেছে, তবে অনুবাদক জি. ডি. সিংহল সুশ্রুতকে কাজের জন্য শল্যচিকিৎসার বিশদ বিবরণ হিসাবে "অস্ত্রোপচারের জনক" বলে অভিহিত করেছেন।

জীবন কার্যক্রম: গঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন নগরী বেনারসে ধর্ম ও জ্ঞানের অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। আদি থেকে এটি হিন্দুদের অতি পবিত্র স্থান হিসেবে খ্যাত। পরবর্তীতে এই নগরী হয়ে উঠেছিলো বৌদ্ধ ধর্ম এবং আয়ুর্বেদের পীঠস্থান। মহর্ষি সুশ্রুত বেড়ে উঠেছিলেন এই প্রাচীন বেনারস শহরে। সেখানেই বিকশিত হয়েছিলো তার প্রতিভা। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি এখানে তার ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। তার অনুসারীদের বলা হতো সৌশ্রুত। সমস্ত সৌশ্রুতকে ছয় বছর ধরে শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। শিক্ষাগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরেই তাদের একটি শপথ নিতে হতো।

নিজের সময় থেকে অনেক অগ্রসর ছিলেন এই মহান চিকিৎসক। তার প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় তার রচিত গ্রন্থে। এই গ্রন্থে রচিত বহু বিষয় আজও প্রাসঙ্গিক। সুশ্রুত মূলত শল্যচিকিৎসায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তবে মেডিসিনেও তার অগাধ ব্যুৎপত্তি ছিলো। তিনি মনে করতেন, পরিপূর্ণ চিকিৎসক হতে গেলে শল্যবিদ্যার পাশাপাশি মেডিসিনের জ্ঞানও আবশ্যক। সুশ্রুত সংহিতায় তিনি শল্যচিকিৎসার পদ্ধতির পাশাপাশি প্রসূতিবিদ্যার নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। মৃত মানুষের অঙ্গ ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে মানবদেহের খুটিনাটি জ্ঞান আহরণের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন এতে।

সার্জারির সংস্কৃত প্রতিশব্দ শল্যচিকিৎসা। ‘শল্য’ শব্দটির অর্থ তীর। সেই সময়ে অধিকাংশ আঘাতের কারণ ছিলো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাওয়া তীরের আঘাত। সেখান থেকেই এই নামের অবতারণা। খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ অব্দে ভারতবর্ষে শল্যচিকিৎসার প্রভূত উন্নতি হয়। সাধারণ কাটাছেঁড়া তো স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো, ভারতীয় শল্যচিকিৎসকবিদগণ নাকের অস্ত্রোপচার (যা আজ আমরা Rhinoplasty হিসেবে জানি) এবং ছানি অপারেশন (ক্যাটার‍্যাক্ট অপারেশন) এ সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আর এ কাজে কিংবদন্তিসম দক্ষতা অর্জন করেছিলেন মহর্ষি সুশ্রুত। বলা হয়ে থাকে, তিনিই উদ্ভাবন করেছিলেন এই পদ্ধতি।

সময় : প্রারম্ভিক পণ্ডিত রুডলফ হোর্নেল প্রস্তাব করেছিলেন যে সুশ্রুত-সংহিতা থেকে কিছু ধারণা শতপথ-ব্রাহ্মণ তে পাওয়া যেতে পারে, যা তিনি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর তারিখের, এবং এই ডেটিং এখনও প্রায়শই পুনরাবৃত্তি হয়। গত শতাব্দীতে, ভারতীয় চিকিত্সা সাহিত্যের ইতিহাসের উপর বৃত্তি যথেষ্ট পরিমাণে অগ্রসর হয়েছে, এবং দৃত প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে যে সুশ্রুত সংহিতা বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্তরগুলির একটি কাজ। এর রচনাটি খ্রিস্টপূর্ব শেষ শতাব্দীতে শুরু হয়েছিল এবং এটি বর্তমান লেখায় এটির আরেকটি লেখকের দ্বারা সম্পূর্ণ হয়েছিল, যিনি এর প্রথম পাঁচটি অধ্যায় পুনরায় প্রেরণ করেছিলেন এবং দীর্ঘ, চূড়ান্ত অধ্যায় যুক্ত করেছিলেন, "উত্তরতন্ত্র"। সম্ভবতঃ সুশ্রুত সংহিতা পণ্ডিত দৃর্দবল ( ৩০০-৫০০ খ্রিস্টাব্দ) এর কাছে পরিচিত ছিলেন, যা আমাদের কাছে যে রচনাটি আজ অবতীর্ণ হয়েছে তার সংস্করণের সর্বশেষতম তারিখ দেয়। ঐতিহাসিক গবেষণার মাধ্যমে এও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে "সুশ্রুত" নামে একাধিক প্রাচীন লেখক রয়েছেন যাঁদের মধ্যে বিবাদ হতে পারে।

উদ্ধৃতিসমূহ : মহাভারত সুশ্রুতকে বিশিষ্ট ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্রদের মধ্যে তালিকাভুক্ত করেছেন। বিশ্বমিত্রের সাথে একই সংযোগটি সুশ্রুত সংহিতায়ও বর্নোনা দেবা আছে।সুশ্রুত নামটি পরবর্তী সাহিত্যে বোভার পান্ডুলিপিতে (খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে) প্রকাশিত হয়েছে,যেখানে সুশ্রুতকে হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী দশটি ঋষির মধ্যে একটি হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

১৭৯২সালে ইংরেজরা যখন টিপুসুলতানের সঙ্গে যুদ্ধ লড়েছিল যাকে আমরা যা মাইসুরের তৃতীয় যুদ্ধ নামে আমরা জানি, তখন টিপু সুলতান এক ইংরেজ বন্দির নাক কেটে দিয়েছিল। সেই সময় সুশ্রুতের অনুসারী শিষ্য সেই বন্দির মাথা থেকে চামড়া নিয়ে আবার তার নাক প্রতিস্থাপন করে দেয়। এই পুরো সার্জারি ব্রিটিশ সার্জেন্ট থমাস ক্রুজ ও জেম্স ফ্যন্লি পুরো জিনিসটা দেখে। এটা ১৭৯৪সালে “দ্যি জেন্টালম্যন্স ম্যগাজিন” ছাপিয়ে দেয়। তখন থেকে সারা বিশ্বে এই টেকনিক ছড়িয়ে পড়ে। আজও কত সার্জারি টেকনিক সুশ্রুতের থেকে এসেছে তা কল্পনার বাইরে।

আধুনিক বিজ্ঞান এ সব পদ্ধতির পুনরাবিষ্কার করেছিল উনিশ শতকে। প্রাচীন এ পাণ্ডুলিপির ঐতিহাসিক মূল্য ও গুরুত্ব বিবেচনায় এনে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

তথ্যসূত্র :


1. উইকিপিডিয়া


2. মহর্ষি সুশ্রুত: প্লাস্টিক সার্জারির জনক 


3. পৃথিবীর প্রথম শল্যচিকিৎসক ও প্লাস্টিক সার্জারির জনক, যার জন্ম আজ থেকে প্রায় ২৬০০ বছর পূর্বে

Post a Comment

উপরের তথ্যটি সম্পর্কিত আপনার কোন জিজ্ঞাসা আছে? বা এর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে এমন কোন বিষয় জানার আছে? থাকলে অবশ্যই সুরুচিপূর্ণ কমেন্ট করে জানান, আমরা নিশ্চয়ই আপনাকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করব এবং এতে উভয়ের জ্ঞানের প্রসার ঘটবে।

Previous Post Next Post